ভুমিকাঃ
১. ইসলামে সুস্থ ও শক্তিশালী শরীরের গুরুত্ব
"শক্তিশালী মোমিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মোমিনের চেয়ে বেশি প্রিয় ও উত্তম, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম)
২. শারীরিক সুস্থতায় নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক কসরত
- হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা: ব্যায়াম হৃদপিণ্ডকে সতেজ রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত মেদ বা চর্বি ঝরাতে শারীরিক কসরত সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।
- মানসিক ক্লান্তি দূর করা: ব্যায়াম করার ফলে শরীরে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনের বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ দূর করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের জীবনের শারীরিক চর্চা
- দৌড় প্রতিযোগিতা: হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর দৌড় প্রতিযোগিতার হাদিস আমাদের সবারই জানা। এটি প্রমাণ করে পরিবারের সদস্যদের সাথে সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক চর্চার সুন্দর সংস্কৃতি ইসলামে বিদ্যমান।
- সাঁতার ও তীরন্দাজি: সন্তানদের সাঁতার কাটা, তীরন্দাজি শেখানো এবং ঘোড়া দৌড় শিখানোর জন্য বিভিন্ন বর্ণনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- কুস্তি ও শারীরিক শক্তি প্রদর্শন: রাসূলুল্লাহ (সা.) তৎকালীন আরবের বিখ্যাত পালোয়ান রুকানার সাথে কুস্তি লড়ে তাকে পরাজিত করেছিলেন।
৪. আধুনিক জীবনযাত্রায় সাইক্লিং ও শারীরিক সুস্বাস্থ্য
৫. দৈনন্দিন জীবনে সুস্থ থাকার কিছু ইসলামিক টিপস
সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions - FAQ)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ইসলাম উভয়ই মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে। একটি রোগমুক্ত ও কর্মক্ষম জীবনের জন্য শারীরিক ব্যায়াম ও সুষম জীবনযাত্রার কোনো বিকল্প নেই। ইসলাম কেবল আত্মিক উন্নতির নির্দেশ দেয় না, বরং শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্বাস্থ্যে জোর দেয়। এ বিষয়ে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. সুস্থ জীবন যাপনে শারীরিক ব্যায়ামের মূল গুরুত্ব কী?
শারীরিক স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম মানুষের হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মাংসপেশি ও হাড়কে শক্তিশালী রাখে। এটি শরীরের রক্তের সংবহন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে, ফলে শরীরের প্রতিটি কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছাতে পারে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমে অলসতা দূর হয় এবং শরীরের অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ
আধুনিক যুগে অনিয়মিত জীবনযাপন ও কায়িক পরিশ্রমের অভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও অতিরিক্ত স্থূলতার মতো অসংক্রামক রোগগুলো মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস করলে এসব জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
২. শারীরিক ব্যায়াম ও সুস্বাস্থ্যে ইসলামের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি কী?
শরীর একটি আমানত
ইসলামে মানুষের শরীরকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত একটি মহামূল্যবান আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আমানতের সঠিক যত্ন নেওয়া, একে রোগমুক্ত রাখা এবং এর সক্ষমতা বজায় রাখা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। অপস্বাস্থ্য বা অবহেলার কারণে শরীর অসুস্থ হলে আল্লাহর দেওয়া অনেক ইবাদতও সঠিকভাবে সম্পাদন করা যায় না।
শক্তিশালী মুমিনের বিশেষ মর্যাদা
হাদিস শরিফে শারীরিক সক্ষমতা ও শক্তিকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
"দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)।
এখানে শারীরিক ও আত্মিক—উভয় প্রকার শক্তির কথাই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা অর্জনে শারীরিক ব্যায়াম মূল ভূমিকা পালন করে।
৩. ইসলামে খেলাধুলা ও ব্যায়ামকে কীভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে?
নবিজি (সা.) ও সাহাবিদের চর্চা
ইসলামি ইতিহাসে সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন খেলাধুলা ও ব্যায়ামের চর্চা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে এবং তাঁর সাহাবিগণ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় এমন খেলায় অংশ নিয়েছেন।
হাদিসে বর্ণিত কিছু বিশেষ শারীরিক চর্চা
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের কয়েকটি বিশেষ শারীরিক কসরত ও খেলায় পারদর্শিতা অর্জনের নির্দেশ দিতেন, যা শারীরিক ব্যায়ামের উৎকৃষ্ট উদাহরণ:
তীরন্দাজি (Archery): যা মনোযোগ ও শরীরের উপরের অংশের শক্তি বৃদ্ধি করে।
অশ্বারোহণ (Horse Riding): যা শরীরের ভারসাম্য, মেরুদণ্ডের শক্তি ও পেশির সক্ষমতা বাড়ায়।
সাঁতার কাটা (Swimming): যা পুরো শরীরের জন্য একটি সেরা অ্যারোবিক ব্যায়াম।
দৌড় প্রতিযোগিতা: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৭৮)।
৪. ব্যায়াম কি কোনো ইবাদতে রূপ নিতে পারে? ইসলাম কী বলে?
নিয়তের প্রভাব ও গুরুত্ব
ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—সব কাজের সওয়াব নিয়তের ওপর নির্ভর করে। কোনো ব্যক্তি যদি এই নিয়তে নিয়মিত ব্যায়াম করে যে:
১. সে নিজের শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখবে।
২. আল্লাহর দেওয়া ফরজ ইবাদতগুলো (যেমন: সালাত, সিয়াম, হজ) সতেজভাবে আদায় করবে।
৩. পরিবার ও সমাজের জন্য হালাল রুজি উপার্জনে সক্ষম থাকবে।
তবে তার এই শারীরিক ব্যায়াম ও শরীরচর্চাও একটি সওয়াবের কাজ বা পরোক্ষ ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হবে।
অলসতা বনাম কর্মক্ষমতা
অলসতা ও শারীরিক স্থবিরতা মানুষকে অপকর্ম ও অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অলসতা ও অক্ষমতা থেকে আশ্রয় চাই।" (সহিহ বুখারি: ২৮২৩)। ব্যায়াম এই অলসতা দূর করতে সরাসরি সাহায্য করে।
৫. মানসিক স্বাস্থ্য ও মেজাজ উন্নত করতে ব্যায়ামের ভূমিকা কী?
মানসিক বিষণ্নতা দূরীকরণ
শারীরিক ব্যায়াম কেবল শরীরের গঠন ঠিক রাখে না, এটি মস্তিষ্কের মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠনেও দারুণ ভূমিকা রাখে। ব্যায়াম করার সময় মানব মস্তিষ্কে 'এন্ডোরফিন' (Endorphin) নামক এক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানুষের মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা দূর করে মনকে প্রফুল্ল রাখে।
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক প্রশান্তি
নিয়মিত ব্যায়াম ও খেলাধুলা মানুষের রাগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য বৃদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। প্রফুল্ল মন নিয়ে যেকোনো কাজে একাগ্রতা আনা সহজ হয়, যা দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আল্লাহর জিকির বা ইবাদতে মনোযোগী হতেও বিশেষভাবে সাহায্য করে।
৬. ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করার সময় ইসলামি শরিয়তের সীমানা কী?
সতর ঢাকা বা শালীনতা বজায় রাখা
ব্যায়াম করার সময় ইসলামি বিধান অনুযায়ী 'সতর' ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক।
পুরুষের সতর: নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ঢেকে রাখতে হবে। টাইট বা এমন পাতলা পোশাক পরা যাবে না যাতে শরীরের সতরের অংশ ফুটে ওঠে।
নারীদের পর্দা: নারীরা সম্পূর্ণ পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে কেবল নারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে বা ঘরের পরিবেশে ব্যায়াম করতে পারেন।
ফ্রি-মিক্সিং বা বেহায়াপনা এড়ানো
ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশা বা মিউজিক ও নগ্নতাযুক্ত পরিবেশ রয়েছে এমন আধুনিক জিম এড়িয়ে চলা উচিত। শালীনতা ও ইসলামি অনুশাসন বজায় রেখে যেকোনো স্থানে শরীরচর্চা করা পুরোপুরি বৈধ।
৭. ওজন কমাতে ও মেদ দূর করতে ব্যায়ামের ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী?
অতিরিক্ত ভোজনের অপকারিতা
ইসলামে অতিরিক্ত আহার ও স্থূলতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"মানুষ পেট অপেক্ষা নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই মানুষের জন্য যথেষ্ট।" (সুনানে তিরমিজি: ২৩৮০)।
ক্যালোরি বার্ন ও ওজনের ভারসাম্য
বৈজ্ঞানিকভাবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খেলে তা শরীরে চর্বি বা মেদ হিসেবে জমা হয়। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এই অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন করে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। অতিরিক্ত মেদ দূর হলে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
৮. নামাজের সাথে কি শারীরিক ব্যায়ামের কোনো সম্পর্ক আছে?
নামাজের শারীরিক উপকারিতা
যদিও সালাত বা নামাজ একটি বিশুদ্ধ ইবাদত এবং এটি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আদায় করা হয়, তবুও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের রুকু, সিজদা ও কিয়ামের মাধ্যমে শরীরের পেশি ও জোড়ায় জোড়ায় একটি চমৎকার হালকা কসরত বা স্ট্রেচিং (Stretching) সম্পন্ন হয়।
নামাজ ও ব্যায়ামের তুলনামূলক আলোচনা
| বিষয় | প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ | শারীরিক ব্যায়াম (Gym/Sports) |
| প্রধান উদ্দেশ্য | আল্লাহর আদেশ পালন ও আত্মিক আত্মশুদ্ধি। | শরীরের পেশি গঠন ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। |
| শারীরিক প্রভাব | রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি, জোড়ার নমনীয়তা ও মানসিক প্রশান্তি। | কার্ডিওভাস্কুলার ফিটনেস, শক্তি বৃদ্ধি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ। |
| প্রয়োজনীয়তা | প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য দৈনিক ফরজ। | স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত দরকারী ও প্রশংসনীয় অভ্যাস। |
ইবাদতের পাশাপাশি ব্যায়াম করলে সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা সিজদায় থাকার মতো শারীরিক সামর্থ্য আরও বৃদ্ধি পায়।
৯. হাঁটা (Walking) কি একটি উপযুক্ত ব্যায়াম? ইসলাম ও বিজ্ঞান কী বলে?
সেরা ও সহজ অ্যারোবিক ব্যায়াম
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন দ্রুত গতিতে ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা (Brisk Walking) পৃথিবীর অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে নিরাপদ ব্যায়াম। এটি বয়স্ক ও তরুণ—সবার জন্যই সমান কার্যকর।
হাঁটার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন
ইসলামে হেঁটে মসজিদে যাওয়া, রোগীকে দেখতে যাওয়া বা ভালো কাজে হেঁটে যাওয়ার বিশেষ সওয়াব রয়েছে। হাদিসে এসেছে, হেঁটে মসজিদে যাওয়ার প্রতি পদক্ষেপে একটি করে পাপ মোচন হয় এবং মর্যাদার একটি করে স্তর বৃদ্ধি পায় (সহিহ মুসলিম: ৬৬৬)। সুতরাং, নিয়ত সঠিক রেখে হাঁটার মাধ্যমে শারীরিক উপকার ও সওয়াব—উভয়টি একসাথে লাভ করা যায়।
১০. ব্যায়ামের ক্ষেত্রে চরমপন্থা বা অতিবাড়াবাড়ির ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ কী?
মধ্যপন্থা অবলম্বন
ইসলাম প্রতিটি বিষয়ে মধ্যপন্থা (Moderation) অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করতে গিয়ে শরীরের ওপর অতিরিক্ত অত্যাচার করা বা ব্যায়ামকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা ইসলামে সমর্থনযোগ্য নয়।
অধিকারের ভারসাম্য
মানুষের জীবনের বিভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন:
"তোমার ওপর তোমার রবের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে এবং তোমার ওপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে।" (সহিহ বুখারি: ১৯৭৩)।
সুতরাং ব্যায়াম এমনভাবে করা যাবে না যাতে ফরজ ইবাদতের সময় নষ্ট হয়, শরীর অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা পরিবার অবহেলিত হয়।
১১. নারীদের জন্য ব্যায়াম ও সুস্বাস্থ্যে ইসলামের নির্দেশনা কী?
নারী স্বাস্থ্যের গুরুত্ব
পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্ম গঠনে নারীদের শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। গর্ভধারণ, সন্তান লালন-পালন এবং সংসারের কাজকর্মের জন্য নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
নারীদের ব্যায়ামের নিরাপদ মাধ্যম
ঘরের ভেতরের ব্যায়াম: ঘরের ভেতরে ট্রেডমিল, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ, ইয়োগা বা ট্রেডমিল ব্যবহার করা।
সংরক্ষিত জিম বা পার্ক: এমন স্থান যেখানে কেবল নারীদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে এবং সম্পূর্ণ পর্দা বজায় রাখা সম্ভব।
শারীরিক কাজকর্ম: ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ ও হাঁটাচলাও ভালো শারীরিক কসরত হিসেবে কাজ করে।
১২. বার্ধক্যে শারীরিক ব্যায়াম ও সচল থাকার গুরুত্ব কী?
জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের হাড়ের ক্ষয় হয়, পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জোড়ায় ব্যথা তৈরি হয়। বৃদ্ধ বয়সে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাচলা করলে হাড় ও পেশি সচল থাকে এবং বয়সের কারণে সৃষ্ট জটিলতা অনেক কম হয়।
নবিজির শেখানো সুস্বাস্থ্য রক্ষার দোয়া
বার্ধক্যের সময় যেন অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হতে হয়, সেজন্য মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের শেষ বয়সেও সুস্থতার জন্য দোয়া করতেন। বয়স্কদের জন্য হালকা কসরত ও হাঁটাচলা তাদের আত্মনির্ভরশীল ও কর্মক্ষম রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
১৩. ব্যায়ামের সাথে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের সম্পর্ক কী?
সুস্থতার তিনটি মূল ভিত্তি
সুস্থ জীবনের জন্য তিনটি বিষয় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল:
১. উপযুক্ত ব্যায়াম: যা শরীরের ক্যালোরি ক্ষয় করে ও অঙ্গপ্রতঙ্গ সচল রাখে।
২. সুষম খাদ্য (Nutrition): ভেজাল মুক্ত ও পরিমিত পরিচ্ছন্ন খাবার গ্রহণ।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম (Rest): শরীর পুনর্গঠনের জন্য রাতের সঠিক বিশ্রাম।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় পরিমিতি
ইসলামে হালাল ও তৈয়ব (পবিত্র ও পুষ্টিকর) খাবার খাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রাত জেগে অহেতুক আড্ডা না দিয়ে দ্রুত ঘুমানোর সুন্নাত শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ব্যায়ামের সাথে সঠিক খাবার ও ঘুম না থাকলে শরীরচর্চার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
১৪. পেশি গঠন (Bodybuilding) বা সুগঠিত শরীরের বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী?
পেশি গঠনের বৈধতা
শরীরের শক্তি বৃদ্ধি, আকর্ষণীয় ও গঠনমূলক অবয়ব তৈরি এবং সুস্থতার জন্য জিম বা বডি বিল্ডিং করা শরিয়তের দৃষ্টিতে একদম জায়েজ ও প্রশংসনীয়।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
১. অহংকার ও রিয়া (দেখানোপনা): লোক দেখানোর জন্য বা মানুষের কাছে অহংকার প্রকাশ করার নিয়তে বডি বিল্ডিং করা হারাম।
২. ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও স্টেরয়েড: দ্রুত পেশি বানানোর জন্য স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কৃত্রিম স্টেরয়েড গ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ, কারণ ইসলামে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হারাম (সুরা বাকারা: ১৯৫)।
৩. অবৈধ পোশাক: পেশি প্রদর্শনের নামে সতর খোলা ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
১৫. সুস্থ জীবনযাপনে ব্যায়ামকারীদের জন্য ইসলামি চেকলিস্ট ও নিয়মাবলী কী?
দৈনন্দিন ব্যায়ামের সহজ ইসলামি গাইডলাইন
| ক্রম | বিষয় | শরিয়ত ও স্বাস্থ্যের নির্দেশনা |
| ১ | নিয়ত সংশোধন | আল্লাহর দেওয়া শরীরকে সুস্থ রেখে ইবাদত ও খেদমতের নিয়ত করা। |
| ২ | পোশাক ও সতর | পুরুষদের নাভি থেকে হাঁটু এবং নারীদের পূর্ণ শালীনতা ও পর্দা মেনে চলা। |
| ৩ | সময় নির্বাচন | নামাজের ওয়াক্ত বা ইবাদতের সময়ে ব্যায়াম না করা (যেমন: ফজরের পর বা আসরের পর উপযুক্ত সময়)। |
| ৪ | পরিবেশ | গান-বাজনা, অশ্লীলতা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশামুক্ত পরিবেশ নির্বাচন। |
| ৫ | পরিমিতিবোধ | অতিরিক্ত শারীরিক ঝুঁকি বা শরীর ধ্বংসকারী অনিয়ম এড়িয়ে চলা। |

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন